কন্টেন্টে যান

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার কারণ কী

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার কারণ কী
Rate this post

বাংলাদেশে অনেকেই হঠাৎ বুকে ধড়ফড়ানি বা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া অনুভব করলে সরাসরি ‘হার্ট অ্যাটাক’ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে যান। তবে সব হার্টবিট বেড়ে যাওয়াই বিপজ্জনক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি অস্থায়ী ও নিরীহ, তবে কিছু লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। এই লেখায় আমরা হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ, প্রাথমিক করণীয় ও কখন সতর্ক হবেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়া কী?

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়াকে চিকিৎসা ভাষায় ট্যাকিকার্ডিয়া বলে। সাধারণত বিশ্রামে একজন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ৬০-১০০ বার থাকে। এর চেয়ে বেশি হলে (বিশেষ করে ১০০-এর ওপরে) সেটিকে ট্যাকিকার্ডিয়া ধরা হয়। অনেক সময় এটি কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের জন্য হয় এবং নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সাধারণ কারণ: দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও শারীরিক অবস্থা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার পেছনে দৈনন্দিন জীবনের কিছু সাধারণ কারণ দায়ী। যেমন:

  • মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: অফিসের চাপ, পরীক্ষার ভয় বা পারিবারিক টেনশনে হঠাৎ করে হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে।
  • ক্যাফেইন ও চা-কফি: অতিরিক্ত চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংকস হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ডিহাইড্রেশন: শরীরে পানি কমে গেলে রক্ত ঘন হয়ে যায়, ফলে হৃদপিণ্ডকে বেশি কাজ করতে হয়।
  • জ্বর বা সংক্রমণ: শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে হার্টবিট বাড়ে।
  • রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া): রক্তে অক্সিজেন কম থাকলে হৃদপিণ্ড দ্রুত পাম্প করে।
  • ঘুম কম হওয়া: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়।

চিকিৎসাগত কারণ: হৃদরোগ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা

কিছু ক্ষেত্রে হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্তর্নিহিত রোগ বা শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। নিচের টেবিলে সাধারণ ও গুরুতর কারণের তুলনা দেওয়া হলো:

সাধারণ ও গুরুতর কারণের তুলনা
কারণ / পরিস্থিতি প্রকৃতি করণীয়
মানসিক চাপ, ক্যাফেইন, ডিহাইড্রেশন অস্থায়ী, সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায় বিশ্রাম, পানি পান, ক্যাফেইন কমানো
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (AFib) হৃদপিণ্ডের উপরের প্রকোষ্ঠে অনিয়মিত তড়িৎ সংকেত ইসিজি করে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
হাইপারথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড হরমোন বেশি) মেটাবলিজম বেড়ে যাওয়ায় হার্টবিট বেড়ে যায় থাইরয়েড প্রোফাইল পরীক্ষা করে এন্ডোক্রিনোলজিস্টের পরামর্শ নিন
ইলেক্ট্রোলাইট imbalance (পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম কম) হৃদপিণ্ডের তড়িৎ কার্যক্রম বিঘ্নিত হয় রক্ত পরীক্ষা করে ঘাটতি পূরণ করুন
ভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া গুরুতর, হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যান

এছাড়াও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন অ্যাজমার ওষুধ, কিছু সর্দির ওষুধ) হার্টবিট বাড়াতে পারে। আপনার যদি আগে থেকে হৃদরোগ থাকে, তাহলে ঢাকা-তে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

জীবনযাত্রার অভ্যাস যা হঠাৎ হার্টবিট বাড়াতে পারে

আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার ট্রিগার হতে পারে। যেমন:

  • ধূমপান: নিকোটিন হৃদপিণ্ডকে উত্তেজিত করে, ফলে হার্টবিট বেড়ে যায়।
  • অ্যালকোহল: অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে ‘হলিডে হার্ট’ নামে একটি অবস্থা দেখা দিতে পারে, যেখানে হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে যায়।
  • অতিরিক্ত চা-কফি ও কোমল পানীয়: বাংলাদেশে অনেকেই দিনে ৫-৬ কাপ চা পান করেন, যা ক্যাফেইনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
  • এনার্জি ড্রিংকস: এগুলোতে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন ও চিনি থাকে, যা হার্টবিট দ্রুত করে।

এই অভ্যাসগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ, তবে যদি বারবার সমস্যা হয় তবে ঢাকা-তে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এর সাথে কথা বলতে পারেন।

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে গেলে কী করবেন?

প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। গভীর শ্বাস নিন (৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৪ সেকেন্ডে ছাড়ুন)। কিছুক্ষণ বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নিন। যদি ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল খেয়ে থাকেন, তাহলে সেটি বন্ধ করুন। পানি পান করুন।

কখন জরুরি বিভাগে যেতে হবে?

  • বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করলে
  • শ্বাসকষ্ট হলে
  • মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে গেলে
  • হার্টবিট খুব দ্রুত (১৫০-এর বেশি) এবং অনিয়মিত মনে হলে
  • একইসঙ্গে ঘাম ও বমি বমি ভাব থাকলে

এমন পরিস্থিতিতে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান। প্রয়োজনে ঢাকা-এর ডাক্তার তালিকা থেকে জরুরি সেবা নিতে পারেন।

কী কী পরীক্ষা করাতে পারেন?

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ে কিছু পরীক্ষা করা হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা হাসপাতাল ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এগুলো পাওয়া যায়।

  • ইসিজি (ECG): হৃদপিণ্ডের তড়িৎ কার্যক্রম রেকর্ড করে। এটি প্রাথমিক ও সহজলভ্য পরীক্ষা।
  • হোল্টার মনিটর: ২৪-৪৮ ঘণ্টা ধরে হার্টবিট রেকর্ড করে, বিশেষ করে যখন ইসিজিতে কিছু ধরা পড়ে না।
  • ইকোকার্ডিওগ্রাম: হৃদপিণ্ডের গঠন ও পাম্প করার ক্ষমতা দেখে।
  • থাইরয়েড প্রোফাইল (TSH, T3, T4): থাইরয়েড সমস্যা সন্দেহ হলে। ঢাকা-তে হরমোন / থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শে এই পরীক্ষা করানো ভালো।
  • ইলেক্ট্রোলাইট প্যানেল: রক্তে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়ামের মাত্রা দেখে।

প্রয়োজনে ঢাকা-তে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর কাছেও যেতে পারেন, কারণ উদ্বেগজনিত কারণেও হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার সময় বুকে ব্যথা না থাকলে কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

হ্যাঁ, বুকে ব্যথা না থাকলেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগী, নারী বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ দেখা যায়, যেখানে বুকে ব্যথার পরিবর্তে হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা পিঠে-চোয়ালে ব্যথা হতে পারে। তাই শুধু বুকে ব্যথা না থাকলেই নিশ্চিন্ত হবেন না—যদি হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়ার ভাব বা প্রচণ্ড দুর্বলতা থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

চা বা কফি খাওয়ার পরই কেন আমার হার্টবিট বেড়ে যায়? এটা কি স্বাভাবিক?

চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক বা সফট ড্রিংকে থাকা ক্যাফেইন একটি উদ্দীপক, যা অস্থায়ীভাবে হার্টের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি সাধারণত নিরীহ এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে যদি প্রতিবার ক্যাফেইন খাওয়ার পরই ধড়ফড়ানি শুরু হয় বা এর সাথে ঘুম না হওয়া, হাত-পা কাঁপা, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে ক্যাফেইনের পরিমাণ কমানো বা চিকিৎসকের সাথে কথা বলা ভালো। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি থাকে।

ঘুম থেকে উঠার সময় বা রাতে শুয়ে থাকার সময় হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যায়—এর কারণ কী?

রাতে বা ঘুম থেকে ওঠার সময় হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার পেছনে সাধারণত হরমোনের পরিবর্তন (যেমন কর্টিসোল লেভেল বেড়ে যাওয়া), ডিহাইড্রেশন, বা রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া দায়ী হতে পারে। এছাড়া স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া) থাকলেও রাতে হঠাৎ ধড়ফড়ানি হতে পারে। যদি এটি নিয়মিত ঘটে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

হার্টবিট বেড়ে গেলে কি পানি পান করা বা গভীর শ্বাস নেওয়া কাজ করে?

হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক করণীয় হিসেবে কাজ করতে পারে। গভীর শ্বাস নেওয়া (ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং) ভ্যাগাস নার্ভকে উদ্দীপিত করে হার্টের গতি ধীর করতে সাহায্য করে। ঠান্ডা পানি পান করলেও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং কিছুটা প্রশান্তি মেলে। তবে এটি শুধুমাত্র অস্থায়ী ব্যবস্থা। যদি ধড়ফড়ানি ১৫-২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, বা বারবার হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার জন্য ইসিজি কি সবসময় প্রয়োজন? অন্য কোনো পরীক্ষা আছে?

ইসিজি (ECG) হলো প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা যা হার্টের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ দেখে। তবে হঠাৎ ধড়ফড়ানি অনেক সময় ইসিজি করার সময় নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসক ২৪ ঘণ্টার হল্টার মনিটর (Holter monitor) বা ইভেন্ট রেকর্ডার ব্যবহার করতে পারেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে হার্টের গতি রেকর্ড করে। প্রয়োজনে ইকোকার্ডিওগ্রাম (হার্টের আল্ট্রাসাউন্ড), ইলেক্ট্রোলাইট ও থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষাও করানো হতে পারে। তাই শুধু ইসিজি নয়, লক্ষণের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসক সঠিক পরীক্ষা নির্বাচন করবেন।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া (কিছু লিংক বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান পাতা):

Rate this post