কন্টেন্টে যান

হাত-পা অবশ এর কারণ কী

হাত-পা অবশ এর কারণ কী
Rate this post

হাত বা পায়ে ঝিনঝিন, অবশ ভাব বা সংবেদনহীনতা – আমরা অনেকেই এই উপসর্গকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। অথচ বাংলাদেশে হাত-পা অবশ হওয়ার পেছনে সাধারণ থেকে শুরু করে গুরুতর কিছু কারণ থাকতে পারে। এই লেখায় আমরা সম্ভাব্য কারণগুলো, কখন এটি সাধারণ আর কখন জরুরি, এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করব। মনে রাখবেন, নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

হাত-পা অবশ কেন হয়? সাধারণ কারণগুলো কী কী?

হাত-পা অবশ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো স্নায়ু চাপা পড়া। যেমন: দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে থাকা, ঘুমানোর সময় হাতের ওপর মাথা দিয়ে ঘুমানো, বা পা চেপে বসে থাকা। এতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিনঝিন বা অবশ ভাব চলে যায়।

আরেকটি সাধারণ কারণ ভিটামিনের অভাব – বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ও বি১ (থায়ামিন)। বাংলাদেশে নিরামিষভোজী বা মেটফরমিন (ডায়াবেটিসের ওষুধ) ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই অভাব বেশি দেখা যায়।

ডায়াবেটিসডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি হাত-পা অবশের আরেকটি প্রধান কারণ (নিচে বিস্তারিত)। এছাড়া থাইরয়েড সমস্যা, রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত (পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ) এবং কিছু অটোইমিউন রোগও দায়ী হতে পারে।

ডায়াবেটিস ও নিউরোপ্যাথি: বাংলাদেশে কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় – এ অবস্থাকে ডায়াবেটিক পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বলে। এর ফলে হাত-পা, বিশেষ করে পায়ের আঙুল ও তলায় ঝিনঝিন, জ্বালা বা অবশ ভাব দেখা যায়।

প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে এই উপসর্গ কমে যেতে পারে। তাই যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের নিয়মিত ঢাকায় ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত। এছাড়া ঢাকার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ নিউরোপ্যাথি নির্ণয় ও চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারেন।

ভিটামিনের অভাব: বি১২ ও বি১-এর ভূমিকা

ভিটামিন বি১২-এর অভাবে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হয়, যার ফলে হাত-পা অবশ, দুর্বলতা ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে নিরামিষভোজী খাদ্যাভ্যাস, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার এবং মেটফরমিন সেবনের কারণে বি১২-এর ঘাটতি প্রচলিত।

ভিটামিন বি১ (থায়ামিন) এর অভাবও ‘বেরি-বেরি’ রোগের মাধ্যমে হাত-পা অবশ তৈরি করতে পারে। যারা প্রচুর পরিমাণে চিনি বা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট খান, তাদের এই ঝুঁকি বেশি।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ভিটামিনের ঘাটতি ধরা পড়ে। প্রয়োজনে ঢাকার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সঠিক সাপ্লিমেন্ট ও ডোজ নির্ধারণ করে দেবেন। নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।

স্ট্রোকের সতর্কতা: কখন হাত-পা অবশ জরুরি?

হঠাৎ করে একপাশের হাত, পা বা মুখ অবশ হয়ে গেলে, সাথে কথা বলতে সমস্যা, মুখ বেঁকে যাওয়া বা দৃষ্টি ঝাপসা হলে – এটি স্ট্রোকের লক্ষণ। এক মিনিটও দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

বাংলাদেশে স্ট্রোকের চিকিৎসায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ (প্রথম ৪-৫ ঘণ্টা) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে মস্তিষ্কের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। স্ট্রোকের পরবর্তী যত্নে নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জন প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যান্য কারণ: থাইরয়েড, গর্ভাবস্থা, অটোইমিউন রোগ ও স্নায়ু সংকোচন

থাইরয়েড সমস্যা – বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজম – স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে হাত-পা অবশ তৈরি করতে পারে। ঢাকার হরমোন বিশেষজ্ঞ থাইরয়েড পরীক্ষা ও চিকিৎসায় সাহায্য করবেন।

গর্ভাবস্থায় হরমোন পরিবর্তন ও পানি জমে স্নায়ু চাপা পড়তে পারে, বিশেষ করে তৃতীয় ত্রৈমাসিকে। এটি সাধারণত প্রসবের পর ঠিক হয়ে যায়।

অটোইমিউন রোগ যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের কারণেও হাত-পা অবশ হতে পারে। এ ধরনের রোগের চিকিৎসায় ঢাকার রিউমাটোলজিস্ট প্রয়োজন।

স্নায়ু সংকোচনের কারণে (যেমন কারপাল টানেল সিনড্রোম বা সায়াটিকা) হাত-পা অবশ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হলে ঢাকার অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ বা ফিজিওথেরাপিস্ট এর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

প্রাথমিক করণীয় ও চিকিৎসা: কী করবেন, কী করবেন না

হাত-পা অবশ দেখা দিলে প্রথমে বোঝার চেষ্টা করুন এটি সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী। যদি দীর্ঘক্ষণ এক姿勢ে থাকার কারণে হয়, তাহলে পজিশন পরিবর্তন, হালকা স্ট্রেচিং ও উষ্ণ সেঁক দিলে স্বস্তি মিলতে পারে। তবে এগুলো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

বাংলাদেশে অনেকেই ‘গ্যাস-ঠান্ডা’ বা ‘বাত’ ভেবে ঘরোয়া চিকিৎসা করেন, যা মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী অবশ হলে অবশ্যই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা নিউরোলজিস্ট দেখাবেন।

নিচের টেবিলে হাত-পা অবশের সাধারণ ও জরুরি কারণের তুলনা দেওয়া হলো:

কারণ বৈশিষ্ট্য কখন ডাক্তার দেখাবেন
স্নায়ু চাপা পড়া (যেমন: দীর্ঘক্ষণ এক姿势) অস্থায়ী, পজিশন পরিবর্তনে সেরে যায় বারবার হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে
ভিটামিন বি১২/বি১-এর অভাব ধীরে ধীরে শুরু হয়, দু’পাশে বা চার অঙ্গে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী অবশ ও দুর্বলতা থাকলে
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি প্রথমে পায়ের আঙুলে ঝিনঝিন, পরে উপরে ওঠে ডায়াবেটিস থাকলে এবং নিয়মিত চেক-আপের অংশ হিসেবে
স্ট্রোক হঠাৎ, একপাশে, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা জরুরি। ১ মিনিট দেরি না করে হাসপাতালে যান
থাইরয়েড সমস্যা অন্যান্য উপসর্গ (ওজন পরিবর্তন, ক্লান্তি) থাকতে পারে সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষা ও এন্ডোক্রিনোলজিস্টের পরামর্শ
অটোইমিউন রোগ জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, চামড়ায় র্যাশ থাকতে পারে রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নিন

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হাত-পা অবশ কখন গুরুতর হয়? কোন কোন লক্ষণের সাথে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দরকার?

যদি হাত-পা অবশ হঠাৎ করে আসে, শরীরের এক পাশে হয়, অথবা মুখ বেঁকে যায়, কথা জড়িয়ে যায়, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা বা দৃষ্টি ঝাপসা হয়, তাহলে এটি স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারানো, বা কোনো দুর্ঘটনার পর অবশ ভাব দেখা গেলেও দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে হবে।

হাত-পা অবশের কারণ খুঁজতে ডাক্তার কী কী পরীক্ষা করতে বলেন?

সাধারণত রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক পরীক্ষা দেখে চিকিৎসক রক্তের সুগার, ভিটামিন বি১২, থাইরয়েড হরমোন, কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। প্রয়োজনে স্নায়ুর ক্ষতি নির্ণয়ে এনসিভি বা ইএমজি এবং মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের সমস্যা দেখতে এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করতে বলা হতে পারে। তবে কোন পরীক্ষা প্রয়োজন তা শুধুমাত্র চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

ডায়াবেটিস না থাকলে কি হাত-পা অবশ বা নিউরোপ্যাথি হতে পারে?

হ্যাঁ, ডায়াবেটিস ছাড়াও আরও অনেক কারণে নিউরোপ্যাথি হতে পারে, যেমন অ্যালকোহল সেবন, ভিটামিন বি১২ বা বি১-এর অভাব, কিডনি রোগ, থাইরয়েড সমস্যা, অটোইমিউন রোগ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং মেরুদণ্ডের স্নায়ুতে চাপ পড়া। বাংলাদেশে ডায়াবেটিসজনিত নিউরোপ্যাথি বেশি দেখা গেলেও এটি একমাত্র কারণ নয়।

হাত-পা অবশ থেকে কি পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব? নাকি স্নায়ুর ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যায়?

এটি মূলত নির্ভর করে কারণ ও চিকিৎসা শুরুর সময়ের উপর। ভিটামিনের অভাব, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ বা স্নায়ুর ওপর চাপ কমানো গেলে অনেক ক্ষেত্রে অবশ ভাব কমে বা সেরে যায়। তবে স্নায়ুর মারাত্মক বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি স্থায়ীও হয়ে যেতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

গর্ভাবস্থায় হাত-পা অবশ হওয়া কি স্বাভাবিক? কখন এটি উদ্বেগের বিষয়?

গর্ভাবস্থায় শরীরে পানি জমা এবং হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন ভাব হতে পারে, বিশেষত শেষের দিকে। তবে হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মুখ বা এক পাশের শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে, বা রক্তচাপ অনেক বেড়ে গেলে এটি প্রি-একলাম্পসিয়া বা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ অবস্থায় দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া (কিছু লিংক বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান পাতা):

Rate this post