কন্টেন্টে যান

বুক ধড়ফড় হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন

বুক ধড়ফড় হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন
Rate this post

হঠাৎ বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হলে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে—এটা কি হার্ট অ্যাটাক? কোথায় যাব? বুক ধড়ফড়ের অনেক কারণই গুরুতর নয়, কিন্তু কখন যে সেটি বড় কোনো সমস্যার সংকেত, তা বোঝা দরকার। এই নিবন্ধে থাকছে রোগীর যাত্রার ধাপ—প্রথমে কোন ডাক্তার দেখাবেন, কী কী পরীক্ষা করাতে হবে, কখন কার্ডিওলজিস্টের কাছে যেতে হবে আর কখন সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ছুটতে হবে।

বুক ধড়ফড় কেন হয়? সাধারণ কারণগুলো জেনে নিন

বুক ধড়ফড় (palpitations) মানে হৃদস্পন্দন এমনভাবে অনুভব হওয়া যেন বুকের ভেতর দাপড়ানি, ছুটোছুটি বা ঝনঝন করছে। এটি কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। ঘন ঘন না হলে এবং অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ না থাকলে এটি বড় বিপদের লক্ষণ নয়। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মানসিক চাপ বা উদ্বেগ: দুশ্চিন্তা, ভয় বা প্যানিক অ্যাটাকের সময় বুক ধড়ফড় হতে পারে।
  • ক্যাফেইন ও উত্তেজক: অতিরিক্ত চা-কফি, এনার্জি ড্রিংক, ধূমপান বা কিছু ওষুধের প্রভাবে ধড়ফড় বাড়তে পারে।
  • রক্তস্বল্পতা: হিমোগ্লোবিন কমে গেলে হৃদপিণ্ডকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে ধড়ফড় দেখা দিতে পারে।
  • থাইরয়েড সমস্যা: হাইপারথাইরয়েডিজমে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়।
  • হৃদরোগ: অ্যারিথমিয়া, হার্টের ভালভের সমস্যা বা হার্ট ফেইলিওরের কারণেও ধড়ফড় হতে পারে।
  • অন্যান্য: জ্বর, ডিহাইড্রেশন, ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা, গর্ভাবস্থা, অ্যালকোহল সেবন।

তাই ধড়ফড় মানেই হার্ট অ্যাটাক নয়। তবে কারণ না জেনে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, তাই একবার ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যাবেন?

নিচের উপসর্গগুলোর যে কোনো একটির সঙ্গে বুক ধড়ফড় হলে দেরি না করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:

  • বুকে ব্যথা, চাপ বা ভারী ভাব
  • শ্বাসকষ্ট
  • মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • একটানা দীর্ঘ সময় ধরে বা বারবার ধড়ফড় হওয়া
  • আগে থেকে হৃদরোগ থাকলে
  • পরিবারে অল্প বয়সে হঠাৎ কার্ডিয়াক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে

এ ধরনের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই নিরাপদ।

রোগীর যাত্রা: প্রথমে সাধারণ চিকিৎসক, তারপর প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ

অনেকেই সরাসরি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে ছুটে যান, কিন্তু বুক ধড়ফড়ের বেশিরভাগ কারণ হৃদরোগ নয়। তাই প্রথম ধাপে একজন এমবিবিএস ডাক্তার বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানোই যৌক্তিক। তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা করেন, প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা বা ইসিজি লিখে দেন এবং ফলাফলের ভিত্তিতে ঠিক করেন কার কাছে যাওয়া দরকার। ঢাকা-তে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অনেক আছেন; প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য তাঁদের মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে পারেন।

নিচের টেবিলে রোগীর যাত্রার ধাপগুলো দেখানো হলো:

বুক ধড়ফড়ের রোগীর যাত্রার ধাপ
ধাপ কী করবেন কোন ডাক্তারের কাছে সাধারণ পরীক্ষা
১ম ধাপ উপসোগ ও জীবনযাত্রা নিয়ে বিস্তারিত বলা সাধারণ চিকিৎসক বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শারীরিক পরীক্ষা, রক্তচাপ, পালস
২য় ধাপ প্রাথমিক চিকিৎসার নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা করা একই চিকিৎসক ইসিজি, সিবিসি, থাইরয়েড প্রোফাইল, ইলেক্ট্রোলাইট
৩য় ধাপ প্রাথমিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিকতা বা বারবার ধড়ফড় কার্ডিওলজিস্ট ইকোকার্ডিওগ্রাম, হোল্টার মনিটর, স্ট্রেস টেস্ট
৪র্থ ধাপ জরুরি উপসর্গ থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ইসিজি, প্রয়োজনে ট্রপোনিন ও অন্যান্য পরীক্ষা

ধড়ফড়ের কারণ যদি প্রাথমিক পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে, যেমন রক্তস্বল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যা, তাহলে সাধারণ চিকিৎসকই চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ইসিজি বা ইকোতে অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে বা ধড়ফড় বারবার ফিরে এলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

কখন কার্ডিওলজিস্টের কাছে যাবেন?

সাধারণ চিকিৎসকের প্রাথমিক মূল্যায়নের পর যদি হৃদরোগের সম্ভাবনা দেখা যায়, তাহলে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে যখন:

  • ইসিজি বা অন্য প্রাথমিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে
  • ধড়ফড়ের সঙ্গে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকে
  • ধড়ফড় বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী হয়
  • পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকে
  • বয়স ৪০-এর বেশি এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকে

এমতাবস্থায় ঢাকা-তে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেতে অনলাইন ডিরেক্টরি কাজে লাগতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগে ডাক্তারের ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতা যাচিয়ে নেওয়া ভালো।

কী কী পরীক্ষা করতে হতে পারে?

ধড়ফড়ের কারণ নির্ণয়ের জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। কোন পরীক্ষা দরকার, তা ডাক্তার উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে ঠিক করবেন। সাধারণত যেসব পরীক্ষা করা হয়ে থাকে:

  • ইসিজি: হৃদস্পন্দনের ছন্দ ও বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করে।
  • হোল্টার মনিটর: ২৪–৪৮ ঘণ্টা ধরে হৃদস্পন্দনের রেকর্ড রাখে; একটানা ধড়ফড় না থাকলেও এটি কার্যকর।
  • ইকোকার্ডিওগ্রাম: আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হার্টের গঠন, ভালভ ও পাম্পিং কার্যকারিতা দেখা হয়।
  • রক্ত পরীক্ষা: হিমোগ্লোবিন, থাইরয়েড হরমোন, ইলেক্ট্রোলাইট—এবং প্রয়োজনে ট্রপোনিনও মাপা হয়।
  • স্ট্রেস টেস্ট: ব্যায়ামের সময় হৃদপিণ্ডের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এই পরীক্ষাগুলোর বেশিরভাগই জটিল নয় এবং রোগীর অবস্থা বুঝে ডাক্তার নিজেই ঠিক করে দেবেন কোনটি প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সঠিক ডাক্তার খুঁজবেন কীভাবে?

বাংলাদেশে বুক ধড়ফড়ের জন্য ডাক্তার খুঁজতে গেলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার:

  • ডাক্তারের ডিগ্রি ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ যাচাই করুন—এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমডি ইত্যাদি।
  • ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা বা হোল্টার মনিটরের সুবিধা আছে এমন হাসপাতাল বা ক্লিনিক বেছে নিন।
  • প্রথমে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো ভালো; প্রয়োজনে তিনি কার্ডিওলজিস্টের কাছে রেফার করবেন।
  • প্রয়োজনে ঢাকা-এর ডাক্তার তালিকা থেকে এলাকাভিত্তিক ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন।
  • একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে দ্বিতীয় মতামত (second opinion) নেওয়া যেতে পারে, তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা যাবে না।

চিকিৎসার পরে ফলো-আপ করণীয়

ধড়ফড়ের কারণ শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা শুরু হলে কিছু বিষয় মেনে চললে সুফল পাওয়া সহজ হয়:

  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন; ডোজ নিজে পরিবর্তন করবেন না বা ওষুধ বন্ধ করবেন না।
  • ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
  • ধড়ফড় আবার শুরু হলে বা নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

বুক ধড়ফড় সবসময় বিপজ্জনক নয়, তবে অগ্রাহ্য করাও ঠিক নয়। কারণ নির্ণয় করে নিয়মিত ফলো-আপ চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বুক ধড়ফড়ের সাথে যদি ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট না থাকে, তাহলে কি ডাক্তার না দেখিয়েও থাকা যায়?

বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে যদি বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ না থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিক জরুরি অবস্থা নাও হতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে এড়িয়ে যাওয়া উচিত। অনেক সময়ই ক্ষণস্থায়ী বা সৌম্য কারণে ধড়ফড় হয়, কিন্তু অন্তর্নিহিত কোনো হার্টের সমস্যা (যেমন অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন) থাকলে তা চিহ্নিত করা জরুরি। তাই অন্তত একবার সাধারণ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা (যেমন ইসিজি) করিয়ে নেওয়া নিরাপদ। নিজে থেকে ‘এটা কিছুই না’ ভেবে বসে থাকবেন না।

রাতে ঘুমের সময় বুক ধড়ফড় শুরু হলে কী করবেন?

রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুক ধড়ফড় করলে প্রথমে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন, পানি পান করুন এবং শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করে দেখুন (যেমন বালিশ উঁচু করে শোয়া)। অনেক সময় অ্যাসিডিটি, দুশ্চিন্তা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণেও এমন হতে পারে। তবে যদি ধড়ফড় ১৫-২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, অথবা বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। নিয়মিত রাতে এমন হলে ঘুম বিশেষজ্ঞ বা কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন।

বুক ধড়ফড় কি প্রেগন্যান্সির সময় স্বাভাবিক? কখন ডাক্তার দেখাবেন?

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন, রক্তের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং জরায়ুর চাপের কারণে অনেক নারীরই বুক ধড়ফড় হতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক। তবে যদি ধড়ফড় খুব ঘন ঘন হয়, দীর্ঘস্থায়ী হয়, অথবা এর সাথে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্ট ও প্রয়োজনে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। গর্ভাবস্থায় আগে থেকে কোনো হার্টের সমস্যা থাকলে নিয়মিত ফলো-আপ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বুক ধড়ফড়ের জন্য ইসিজি করালে যদি কিছু না আসে, তাহলে কি নিশ্চিন্ত থাকা যাবে?

ইসিজি শুধু সেই মুহূর্তের হার্টের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ দেখায়। অনেক সময় ধড়ফড় এলোমেলোভাবে আসে-যায়, তাই সাধারণ ইসিজিতে কিছু ধরা নাও পড়তে পারে। এর মানে এই নয় যে সমস্যা নেই। যদি আপনার উপসর্গ বারবার ফিরে আসে, তাহলে চিকিৎসক হয়তো ২৪ ঘণ্টার হল্টার মনিটর বা ইভেন্ট রেকর্ডার ব্যবহার করার পরামর্শ দিতে পারেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে হার্টের ছন্দ রেকর্ড করে। তাই ইসিজি স্বাভাবিক এলেও উপসর্গ থাকলে কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত।

বুক ধড়ফড়ের জন্য কি সরাসরি কার্ডিওলজিস্টের কাছে যাওয়া উচিত, নাকি আগে সাধারণ ডাক্তার দেখানো ভালো?

এটি নির্ভর করে উপসর্গের তীব্রতার ওপর। যদি বুক ধড়ফড়ের সাথে তীব্র বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা রক্তচাপ অনেক কমে যাওয়ার মতো জরুরি লক্ষণ থাকে, তাহলে সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। অন্যথায়, প্রথমে একজন সাধারণ চিকিৎসক (এমবিবিএস বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) দেখানো ভালো। তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করবেন এবং প্রয়োজন মনে করলে কার্ডিওলজিস্টের কাছে রেফার করবেন। তবে আপনার যদি আগে থেকে হার্টের কোনো পরিচিত রোগ থাকে, তাহলে সরাসরি কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

এলাকার ডাক্তার খুঁজুন

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া (কিছু লিংক বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান পাতা):

Rate this post